ইলম কত প্রকার ও কী কী: দলীল-প্রমাণসহ বিশদ আলোচনা
- আপলোড সময় : ১০:২৯:০৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫
- / ২০৯ বার পড়া হয়েছে
মুমিনুল ইসলাম আযহারি
……………………………….
মানুষের সর্বোচ্চ বৈশিষ্ট্যের অন্যতম হলো জ্ঞান বা ইলম। ইলমের মাধ্যমে মানুষ সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝে, সঠিক পথ গ্রহণ করে ও আল্লাহ্র পরিচয় লাভ করে। ইসলামে ইলমের গুরুত্ব অপরিসীম; কুরআন ও হাদীস ইলমের মর্যাদাকে অত্যন্ত উচ্চ করেছে। তবে “ইলম” শুধুমাত্র তথ্যের ভাণ্ডার নয়—বরং ইলমের বিভিন্ন স্তর, প্রকৃতি ও প্রকার রয়েছে, যা ইসলামী উসূলবিদদের মতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রবন্ধে ইলমকে প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত করা হবে এবং প্রতিটি বিভাগের দলীল-প্রমাণ উল্লেখ করা হবে।
ইলমের প্রথম বিভাগ: ইলমে জরুরি (العلم الضروري):
ইলমে জরুরি হলো এমন জ্ঞান, যা কোনো ধরনের গবেষণা, চিন্তা-ভাবনা বা যুক্তি প্রয়োগ ছাড়াই মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই জ্ঞান জন্মগত, সরাসরি অনুভূত বা স্বতঃসিদ্ধ।
উসূলুশ-শাস্রবিদ আল-বাজদাবী ইলমে জরুরির সংজ্ঞা প্রদান করেছেন—
“العلم الضروري ما يقع بنفسه بغير نظر”
(أصول البزدوي بشرح عبد العزيز البخاري، ج১، ص ২৩)
অর্থাৎ—যে জ্ঞান চিন্তা-ভাবনা ছাড়া নিজে থেকেই মনের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটাই ইলমে জরুরি।
যেমন—আগুন পোড়ায়, পানি ভেজায়, সূর্য আলো দেয়, মানুষ ক্ষুধা পায়—এসব বিষয়ে কোনো যুক্তি বা প্রমাণের প্রয়োজন হয় না। কুরআনেও বলা হয়েছে—
“وَجَحَدُوا بِهَا وَاسْتَيْقَنَتْهَا أَنفُسُهُمْ”
(সুরা নমল 27:14)
অর্থাৎ—তাদের অন্তর যে সত্যকে নিশ্চিত করে ফেলেছে, তারা তা অস্বীকার করেছে।
এ আয়াত প্রমাণ করে যে কিছু সত্য মানুষের প্রাকৃতিক জ্ঞানের মাধ্যমে স্বভাবগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই ইলমে জরুরি।
ইলমের দ্বিতীয় বিভাগ: ইলমে নজরী (العلم النظري):
ইলমে নজরী হলো এমন জ্ঞান, যা গবেষণা, চিন্তা, যুক্তি, প্রমাণ, কিয়াস বা বিশ্লেষণের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। এটি মানুষের চর্চা ও বৌদ্ধিক প্রয়াসের ফসল।
আল-বাজদাবী বলেন—
“العلم النظري ما لا يحصل إلا بالنظر والاستدلال”
(أصول البزدوي، ج১، ص ২৪)
অর্থ:—যে জ্ঞান গবেষণা ও যুক্তি ছাড়া অর্জিত হয় না।
ইমাম আল-আমিদী ইলমে নজরীকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন—
“النظري ما يفتقر إلى نظر وكسب”
(الإحكام في أصول الأحكام، ج১، ص ৪৪)
ইলমে নজরীর উদাহরণ অত্যন্ত বিস্তৃত—
আল্লাহ্র একত্ব প্রমাণ, নবুওতের সত্যতা, ফিকহের ক্বাওয়ায়েদ, কিয়াস, ইজমা, ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্ণনা ইত্যাদি।
কুরআনে গবেষণামূলক জ্ঞান অর্জনের জন্য নির্দেশ এসেছে—
“قُلِ انْظُرُوا مَاذَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ” (ইউনুস 10:101)
অর্থ—তোমরা আসমান-যমীনে চিন্তা করে দেখো।
এ আয়াত ইলমে নজরী অর্জনের উৎস, কারণ এখানে চিন্তা ও গবেষণার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইলমের তৃতীয় প্রকার: তাসাউর ও তাসদীক (التصور والتصديق):
ইলমের প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে “তাসাউর” ও “তাসদীক” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুই বিভাগ।
তাসাউর (التصور):
তাসাউর হলো—কোনো বস্তুর সম্পর্কে বিচ্ছিন্ন, সহজ ও সাধারণ ধারণা পাওয়া, যেখানে সত্য-মিথ্যার বিচার নেই।
আল-বাজদাবী বলেন—
“التصوّر إدراك الشيء من غير حكم”
(أصول البزدوي، ج১، ص ৩০)
যেমন—“পাহাড়”, “সমুদ্র”, “গাছ” শব্দ শুনে মানুষের মনে একটি ধারণা তৈরি হয়, কিন্তু এটি সত্য নাকি মিথ্যা—সেটি নির্ণয় করা হয় না। এই ধাপটি কেবল ধারণা তৈরি করা।
তাসদীক (التصديق):
তাসদীক হলো—কোনো বিষয়ের সত্য বা মিথ্যা হওয়াকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা ও মেনে নেওয়া।
বাজদাবী বলেন—
“التصديق هو الحكم للشيء أو عليه”
(أصول البزدوي، ج১، ص ৩১)
যেমন—
“সূর্য পূর্ব দিক থেকে ওঠে”— এটি সত্য বলে গ্রহণ করা তাসদীক।
“মুহাম্মদ ﷺ আল্লাহর রাসূল”—এ সত্য গ্রহণ করাও তাসদীক।
তাসাউর ধারণার পর্যায়, আর তাসদীক নিশ্চিত বিশ্বাসের পর্যায়।
শরীয়তের দৃষ্টিতে ইলমের অতিরিক্ত বিভাগ:
ইলমকে ইসলাম আরও দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে ভাগ করেছে—
১. فرض عين (ব্যক্তিগত ফরয জ্ঞান)
এটি প্রত্যেক মানুষের জন্য আবশ্যিক।
রাসুল ﷺ বলেন—
“طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ”
(ইবন মাজাহ, হাদীস 224)
এর মধ্যে রয়েছে—
নামাজ, রোজা, হালাল-হারাম, ঈমান–আকীদা, ব্যবসার হুকুম, পারিবারিক দায়িত্ব ইত্যাদি।
২. فرض كفاية (সমষ্টিগত ফরয জ্ঞান)
যেমন—
ফিকহ, হাদীস, তাফসীর গবেষণা, রাষ্ট্র পরিচালনা, চিকিৎসা, সামরিক বিজ্ঞান প্রভৃতি।
দলীল—
“فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ”
(তওবা 9:122)
—
উপসংহার:
ইলম মানবজীবনের আলো। কিন্তু সব জ্ঞান একই স্তরের নয়। ইসলামী উসূলবিদরা ইলমকে এমনভাবে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন, যাতে জ্ঞানের প্রকৃতি ও অর্জনের উপায় বুঝতে সহজ হয়। ইলমে জরুরি মানুষের প্রাকৃতিক উপলব্ধির জ্ঞান; ইলমে নজরী মানুষকে গবেষণা ও যুক্তির পথে নিয়ে যায়; আর তাসাউর ও তাসদীক ইলমের গঠন প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে। ইসলামে প্রকৃত ইলম হলো সেই জ্ঞান, যা মানুষকে সত্যে উপনীত করে, আল্লাহ্র পরিচয় দেয় এবং জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।
এই শ্রেণিবিভাগগুলো জানা শিক্ষার্থী, গবেষক ও আলেমদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কারণ এর মাধ্যমে প্রমাণ-যুক্তির ভিত্তি, শরীয়তের বিধান প্রণয়ন ও আকীদাগত সত্যগুলি সুস্পষ্ট হয়।

























