শক্তি নয়, নীতি: বৈশ্বিক সংঘাতে মুসলিম বিশ্বের আদর্শ অবস্থান কী হওয়া উচিত
- আপলোড সময় : ১০:১৮:৪৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬
- / ২১৪ বার পড়া হয়েছে
বিশ্ব রাজনীতি আজ এক অস্থির সময় অতিক্রম করছে। পারমাণবিক অস্ত্র, সামরিক জোট, নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের হুমকি, সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ক্রমেই শক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরান–আমেরিকা–ইসরাইল উত্তেজনা শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়; বরং এটি বৈশ্বিক ন্যায়বিচার, দ্বৈত মানদণ্ড এবং শক্তির অপব্যবহারের এক নগ্ন উদাহরণ। প্রশ্ন ওঠে, এই পরিস্থিতিতে মুসলিম বিশ্বের আদর্শ অবস্থান কী হওয়া উচিত?
প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় একটি স্পষ্ট দ্বৈত মানদণ্ড বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র নিরাপত্তার প্রতীক, অথচ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে তা ‘হুমকি’।
ইসরাইল প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হলেও আন্তর্জাতিক চাপ নেই; আর ইরান অস্ত্র না বানানোর দাবি করেও নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হুমকির মুখে। এই বৈষম্য মুসলিম বিশ্বকে নৈতিকভাবে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে, আন্তর্জাতিক আইন কি সবার জন্য সমান?
তবে এখানে মুসলিম বিশ্বের প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত আবেগনির্ভর নয়, বরং নীতি ও যুক্তিনির্ভর। ইসলাম কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে শেখায় না, আবার অন্ধ প্রতিশোধ ও ধ্বংসাত্মক সংঘাতকেও সমর্থন করে না। কুরআনের নির্দেশ, “ন্যায়ের ওপর অবিচল থাকো”—এটি শুধু অভ্যন্তরীণ সমাজের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক আচরণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
মুসলিম বিশ্বের আদর্শ অবস্থান হওয়া উচিত গণবিধ্বংসী অস্ত্রকে গৌরবের প্রতীক না বানিয়ে নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার বৈধ সক্ষমতা গড়ে তোলা। পারমাণবিক বোমা নয়, বরং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কূটনৈতিক ঐক্য, এসবই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার আসল ভিত্তি। শক্তি প্রয়োজন, কিন্তু সেই শক্তি যেন নৈতিক সীমা অতিক্রম না করে।
একই সঙ্গে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাব আজ সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। বিভক্ত মুসলিম বিশ্ব সহজেই বৈশ্বিক শক্তির চাপের শিকার হয়। যৌথ কূটনীতি, সম্মিলিত অবস্থান এবং পারস্পরিক আস্থাই পারে মুসলিম বিশ্বের কণ্ঠকে শক্তিশালী করতে। একক রাষ্ট্র নয়, সম্মিলিত মুসলিম অবস্থানই আন্তর্জাতিক পরিসরে মর্যাদা তৈরি করতে পারে।
এক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্ব চাইলে একটি সাহসী ও নৈতিক প্রস্তাব সামনে আনতে পারে, পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত মধ্যপ্রাচ্য। যেখানে কোনো রাষ্ট্রই গণবিধ্বংসী অস্ত্র রাখবে না; নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে সমতার ভিত্তিতে। এতে মুসলিম বিশ্ব অভিযুক্তের আসন থেকে নেমে এসে নৈতিক নেতৃত্বের জায়গায় দাঁড়াতে পারবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কোনো একটি অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়। তা নির্ভর করে শিক্ষা, বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও মানবসম্পদের উন্নয়নের ওপর। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে জাতি জ্ঞান ও অর্থে শক্তিশালী হয়, তাকে দমন করতে যুদ্ধের প্রয়োজন পড়ে না।
সুতরাং মুসলিম বিশ্বের আদর্শ অবস্থান হওয়া উচিত- শক্তির মোহ নয়, নীতির দৃঢ়তা; যুদ্ধের হুমকি নয়, ন্যায়ভিত্তিক শান্তি; বিভক্তি নয়, ঐক্য। এই পথই মুসলিম বিশ্বকে বৈশ্বিক রাজনীতিতে সম্মানজনক ও প্রভাবশালী অবস্থানে পৌঁছে দিতে পারে।













