পাঁচ দশকে প্রথমবার শিল্প খাতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি: শেয়ারবাজারে নতুন সংকটের অশনিসংকেত!
- আপলোড সময় : ০১:১৭:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
- / ২০৫ বার পড়া হয়েছে
শিল্প খাতের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি শুধু উৎপাদনের সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের শেয়ারবাজার, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বহুমাত্রিক ঝুঁকির বার্তা। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা কমে গেলে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির আয়, লভ্যাংশ ও বাজারমূল্যও চাপে পড়বে। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন এক সময়ে এই সংকট সামনে এসেছে, যখন দেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরেই তারল্য সংকট, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং দুর্বল লেনদেনের সঙ্গে লড়াই করছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে আত্মতুষ্টির আর কোনো সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে দেশের উন্নয়নের যে গল্প বলা হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল শিল্পায়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতি। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ত্রৈমাসিক জিডিপি প্রতিবেদন সেই আত্মবিশ্বাসে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরে প্রথমবারের মতো দেশের শিল্প খাত ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে নেমে এসেছে। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচকের অবনতি নয়; এটি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং শিল্প খাতের প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলার একটি নির্মম প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি দেশের শেয়ারবাজারের জন্যও একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা, কারণ শিল্প খাতের দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাজারের আর্থিক ভিত্তিকেও নড়বড়ে করে দেয়।
শিল্প খাতের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি এমন একটি সংকেত, যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি আজ কৃষি নয়, বরং শিল্প ও সেবাখাত। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় পুরোটাই শিল্পনির্ভর। কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, ব্যাংক ঋণের প্রবাহ, বন্দর কার্যক্রম, পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি এবং দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ বৃহৎ কোম্পানির ব্যবসায়িক সাফল্য- সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু এই শিল্প খাত। সেই খাত যখন সংকুচিত হতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে অর্থনীতির ভেতরে গভীর কোনো অসুস্থতা বাসা বেঁধেছে।
শেয়ারবাজারের সঙ্গে শিল্প খাতের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বস্ত্র, প্রকৌশল, সিমেন্ট, সিরামিক, ওষুধ, জ্বালানি, বহুজাতিক কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ অধিকাংশ খাতের আয় ও মুনাফা সরাসরি শিল্প উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। শিল্প উৎপাদন কমে গেলে বিক্রি কমে, মুনাফা কমে, নগদ প্রবাহ দুর্বল হয় এবং শেষ পর্যন্ত কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ও লভ্যাংশ বিতরণের সক্ষমতা কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শেয়ারের বাজারদরে। ফলে শিল্প খাতের এই ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি শুধু জাতীয় অর্থনীতির জন্য নয়, দেশের পুঁজিবাজারের জন্যও একটি বড় অশনিসংকেত।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকট হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। গত এক বছরের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক পরিসংখ্যানই বলে দেয়, শিল্প খাত ধীরে ধীরে পতনের দিকে এগিয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৮২ শতাংশ, দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা নেমে আসে ১.২৭ শতাংশে এবং তৃতীয় প্রান্তিকে ঋণাত্মক -০.২৮ শতাংশে। অর্থ্যাৎ সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট সময় ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো- সেই সতর্কবার্তা কি নীতিনির্ধারকেরা শুনেছিলেন, নাকি শুনেও গুরুত্ব দেননি?
আজ বাস্তবতা হলো, শিল্প উদ্যোক্তারা একযোগে একই অভিযোগ করছেন- গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, ডলার নেই, ব্যাংক ঋণ ব্যয়বহুল, কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা, নীতিতে অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক হয়রানি। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান তখনই উৎপাদন বাড়ায়, যখন সে নিশ্চিত থাকে যে তার কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি থাকবে, কাঁচামাল সময়মতো পৌঁছাবে, ব্যাংক থেকে প্রতিযোগিতামূলক সুদে ঋণ পাওয়া যাবে এবং সরকারের নীতিতে হঠাৎ অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন আসবে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে এই চারটি মৌলিক নিশ্চয়তার একটিও উদ্যোক্তারা পাননি।
জ্বালানি সংকট শিল্প খাতকে সবচেয়ে বড় আঘাত করেছে। অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ এতোটাই কম যে উৎপাদন লাইন পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয়নি। কোথাও উৎপাদন সময় কমিয়ে আনতে হয়েছে, কোথাও ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমেছে এবং অনেক রপ্তানি আদেশও হারাতে হয়েছে। শিল্পনীতি কাগজে যতোই আকর্ষণীয় হোক, কারখানার চিমনিতে যদি গ্যাস না জ্বলে, তাহলে সেই নীতির কোনো বাস্তব মূল্য থাকে না।
অর্থনীতির আরেকটি বড় ব্যর্থতা হলো বিনিয়োগের পরিবেশ। দীর্ঘদিন ধরে সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের কথা বলছে। কিন্তু বাস্তবে বিনিয়োগকারীরা কি দেখছেন? উচ্চ সুদের হার, অনিশ্চিত বৈদেশিক মুদ্রা বাজার, কর কাঠামোর ঘনঘন পরিবর্তন, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং নীতিগত অসঙ্গতি। বিনিয়োগকারীরা আবেগ দিয়ে নয়, আস্থা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। এই আস্থাহীনতা এখন শুধু শিল্পে নয়, শেয়ারবাজারেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও শিল্পের সংকটকে ভয়াবহ করেছে। খেলাপি ঋণের পাহাড়, তারল্য সংকট এবং ঋণের উচ্চ ব্যয় উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে ব্যাংকগুলো শিল্পে নতুন বিনিয়োগের জ্বালানি হওয়ার কথা, তারাই এখন নিজেদের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যস্ত। ফলাফল- শিল্পে নতুন বিনিয়োগ কমছে, উৎপাদন কমছে, কর্মসংস্থান কমছে এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয় নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
শেয়ারবাজারের ইতিহাস বলে, অর্থনীতির বাস্তব খাত দুর্বল হলে পুঁজিবাজার কখনো দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী থাকতে পারে না। শিল্প উৎপাদন কমে গেলে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মুনাফা কমবে, মূল্য-আয় (পি/ই) অনুপাতের ওপর চাপ বাড়বে, লভ্যাংশ কমবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও দুর্বল হবে। এর ফলে বাজারে নতুন বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরাও আরও সতর্ক অবস্থান নিতে পারেন।
অবশ্যই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মন্দা বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু এই যুক্তি দিয়ে সব দায় এড়ানো যাবে না। কারণ একই বৈশ্বিক বাস্তবতায় ভিয়েতনাম, ভারত কিংবা ইন্দোনেশিয়া তাদের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানির গতি পুরোপুরি হারায়নি। পার্থক্য হলো, তারা দ্রুত নীতিগত সমন্বয় করেছে, আর আমরা দীর্ঘ সময় ধরে সংকটকে অস্বীকার করেছি।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো কর্মসংস্থান। শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক মানে শুধু উৎপাদন কমে যাওয়া নয়; এর অর্থ নতুন চাকরি কমে যাওয়া, অতিরিক্ত সময়ের কাজ বন্ধ হওয়া, শ্রমিক ছাঁটাই এবং পরিবারের আয় কমে যাওয়া। আয় কমলে ভোগ কমে, ভোগ কমলে ব্যবসা আরও সংকুচিত হয়। অর্থনীতি তখন একটি বিপজ্জনক নিম্নমুখী চক্রে আটকে যায়। বাংলাদেশ কি সেই চক্রে প্রবেশ করছে? বিবিএসের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অন্তত সেই আশঙ্কাই জোরালো করছে।
এখন প্রশ্ন হলো- দায় কার? বৈশ্বিক পরিস্থিতির? নাকি দেশের নীতিনির্ধারণীদের? বাস্তবতা হলো, দায় উভয়েরই, তবে অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতার দায় অনেক বেশি। বহু বছর ধরে শিল্প খাতের বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সতর্ক করলেও সেগুলোকে অনেক সময় বিচ্ছিন্ন অভিযোগ হিসেবে দেখা হয়েছে। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে সমন্বয়ের ঘাটতি, জ্বালানি পরিকল্পনায় দূরদর্শিতার অভাব, ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে ধীরগতি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে ব্যর্থতা- এসবের সম্মিলিত ফল আজকের এই সংকট।
নীতিনির্ধারকদের এখন সবচেয়ে বড় ভুল হবে যদি তাঁরা এটিকে একটি সাময়িক পরিসংখ্যানগত বিচ্যুতি হিসেবে দেখেন। কারণ শিল্প খাত একবার সংকুচিত হলে সেটিকে পুনরুদ্ধার করতে বহু বছর সময় লাগে। একটি কারখানা বন্ধ হলে শুধু উৎপাদন বন্ধ হয় না; দক্ষ শ্রমিক হারিয়ে যায়, সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে, বিদেশি ক্রেতার আস্থা নষ্ট হয় এবং বিনিয়োগকারীরা বিকল্প বাজার খুঁজতে শুরু করেন। হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে কঠিন কাজ।
এখন প্রয়োজন কসমেটিক ঘোষণা নয়, সাহসী অর্থনৈতিক সংস্কার। শিল্পকে বাঁচাতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। উৎপাদনমুখী খাতে সাশ্রয়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। কর ও শুল্কনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে হবে। কাঁচামাল আমদানির জটিলতা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করে একটি কার্যকর শিল্প পুনরুদ্ধার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
এর পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদের একটি মৌলিক সত্য স্বীকার করতে হবে- শিল্পায়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের নাম নয়; এটি আস্থা নির্মাণেরও নাম। বিনিয়োগকারীরা রাস্তা, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিশ্চয়তা চান। সেই আস্থা পুনর্গঠন ছাড়া কোনো প্রণোদনা বা কর ছাড়ই কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন থেকে উন্নত অর্থনীতির পথে যাত্রার কথা বলছে। কিন্তু সেই যাত্রার ইঞ্জিন যদি শিল্প খাতই হয়, আর সেই ইঞ্জিন যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে উন্নয়নের ট্রেন সামনে এগোবে কীভাবে? পাঁচ দশকে প্রথমবার শিল্প খাতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি আসলে একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। এই বার্তাকে যদি গুরুত্ব দেওয়া না হয়, তাহলে আগামী দিনে নিম্ন প্রবৃদ্ধি, উচ্চ বেকারত্ব, বিনিয়োগ সংকট এবং রাজস্ব ঘাটতির মতো বহুমাত্রিক সংকট একসঙ্গে দেখা দিতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই, পাঁচ দশকে প্রথমবার শিল্প খাতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়; এটি শিল্পনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ, ব্যাংকিং খাত এবং শেয়ারবাজার- সবকিছুর জন্য একযোগে বেজে ওঠা বিপদসংকেত। শিল্প খাত যদি দ্রুত ঘুরে না দাঁড়ায়, তাহলে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয়, লভ্যাংশ ও বাজারমূল্য আরও চাপে পড়বে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটকে আরও গভীর করবে। তাই এখন প্রয়োজন সাময়িক আশ্বাস নয়, বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক সংস্কার। কারণ শিল্পের চাকা থেমে গেলে শুধু উৎপাদন নয়- স্থবির হয়ে পড়ে শেয়ারবাজার, বিনিয়োগ এবং উন্নয়নের পুরো কাঠামো। বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প টিকিয়ে রাখতে হলে শিল্পকে বাঁচাতেই হবে, আর শিল্পকে বাঁচাতে হলে এখনই সাহসী, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।
লেখক: হাসান কবির জনি
প্রকাশক ও সম্পাদক, বিজনেস জার্নাল।

























